মাতৃভাষা সংরক্ষণের দাবি রাখাইন নৃগোষ্ঠীর
মায়ের ভাষায় নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারলেও তা পড়তে বা লিখতে পারে না সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ। স্কুলে বাংলা ও ইংরেজি শেখানো হয়। কারিকুলামে রাখাইন ভাষার কোন বই এবং সংশ্লিষ্ট কোন শিক্ষক না থাকায় তারা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মাতৃভাষায় জ্ঞান অর্জন করতে। ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে বসেছে তাদের ভাষা।
তবে নিজস্ব ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের কারনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলাপাড়া উপজেলার মিশ্রি পাড়ায় সীমা বৌদ্ধ বিহারে রাখাইন শিশুদের ভাষা শেখাচ্ছেন সেখানকার ধর্মগুরু উত্তম ভিক্ষু। ২০১৫ সাল থেকে তিনি চেষ্টা করছেন বিলুপ্তপ্রায় ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার। প্রত্যেকে রাখাইন এলাকায় একটি করে স্কুল, বই, কারিকুলাম প্রস্তুতসহ শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।
উত্তম ভিক্ষু বলেন, আগে এ অঞ্চলে অনেক রাখাইনরা বসবাস করত প্রত্যেক পাড়ায় শিক্ষক রেখে পাঠশালার মাধ্যমে রাখাইন ভাষা শেখানো হত। কালের বিবর্তনে রাখাইনদের সংখ্যা কমে গেছে অর্থাভাবে পাঠশালাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। রাখাইন ছেলে-মেয়েরা স্কুলে গিয়ে বাংলা আর ইংরেজি পড়ে। কিন্তু কারিকুলামে রাখাইন ভাষা অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ছেলে মেয়েরা তা শিখতে পারছে না। সব বিষয় বিবেচনা করে সীমা বৌদ্ধ বিহারে কিছু সংখ্যক ছেলে মেয়েকে রাখাইন ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়।
রাখাইন শিশু সুনন্দা শ্রমন বলেন, আমাদের ভাষা শেখার জন্য কোন ব্যবস্থা নাই, বান্তের (ধর্মগুরু) কাছে পড়ি সে আমাদের শিখায়।
অংশুমান রাখাইন বলেন, আমাদের রাখাইন ভাষার বই নাই, শিক্ষক নাই। স্কুলে শিখালে আমরা শিখতে পারি।
সুচিংম বলেন, বান্তে যা পড়ায় আমরা তাই শিখি। সরকার সব ভাষায় বই দেয় কিন্তু আমাদের ভাষার কোন বই নাই। আমাদের স্কুলে বই ও শিক্ষক দিলে ভালোভাবে শিখতে পারব।
অবিভাবক জেমা বলেন, আমরা যতটুকু জানি বাচ্চাদের সাথে কথা বলি ওরা শেখে কিন্তু লিখতে পারে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে ভাষাও হারিয়ে যাবে। আমাদের ভাষা সংরক্ষণে অবিলম্বে সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিৎ।
মিশ্রিপাড়ার সভাপতি মংলাচিন বলেন, আমরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও এখন ক্ষয়িষ্ণু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছি। আমাদের ভাষা ধরে রাখার জন্য সরকার এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় আমরা খুবই মর্মাহত। স্কুল, কলেজ মাদ্রাসাগুলোতে আমাদের ভাষা শেখার কোন ব্যাবস্থা নেই। বান্তের কাছে যেটুকু শেখে তাতেতো চলেনা। সরকার এ বিষয়ে একটু পদক্ষেপ নিলে আমদের ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রেহাই পেতো। রাখাইন ভাষাকে শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তির জোড় দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংরে সভাপতি নিউ নিউ খেইন বলেন, আড়াই’শ বছরেরও বেশি সময় ধরে পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় রাখাইন জনগোষ্ঠীর বাস। বর্তমানে আমাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ভাষার বই পুস্তক ও চর্চা যথেষ্ট পরিমানে না থাকায় শিশুরা তা শিখতে পারছেনা। নিজস্ব উদ্যোগে দুএকটি মন্দিরে ভাষা শিষ্কার ব্যাবস্থা করা হলেও তা নিতান্তই অপ্রতুল। তাই কারিকুলাম তৈরি করে রাখাইন শিশুদের ভাষা শেখানোর দাবি জানান তিনি।
পটুয়াখালী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষানুরগী ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব প্রফেসর এম. নুরুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে তার ভাষা তাই এগুলো সংরক্ষনে সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।
বিষয়টি সরকারি পরিকল্পনায় রয়েছে, এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির পাঁচটি ভাষায় বই রচনা করা হয়েছে। সার্ভে করে রাখাইন উপজাতির ভাষায় শিক্ষা প্রসারের জন্য অচিরেই প্রস্তাবনা দেয়া হবে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোল্লা বক্তিয়ার রহমান।
আড়াই’শ বছর আগে মায়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতারিত হয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়া-কুয়াকাটা ও রাঙ্গাবালীতে বসতি গড়ে তোলে রাখাইন উপজাতীয়রা। জেলায় প্রায় ১০ হাজার রাখাইন উপজাতীয়দের বসবাস রয়েছে।

Join the conversation