পৃথিবীর কোনো দেশে এতবার সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসেনি: প্রধানমন্ত্রী
পৃথিবীর কোনো দেশে তাদের নিজ সংস্কৃতির ওপর এতবার আঘাত আসেনি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা বারবার বাংলার ওপর আঘাত হেনেছে। সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এসময় ২ প্রতিষ্ঠান ও ১৯ ব্যক্তির হাতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও জানান, গুণীজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আমাদের দেশকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমরা আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাবো।
পাকিস্তানি শোষকদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসনের কথা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামে একটি দেশের সৃষ্টি হয়, যারা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। একসময় তারা আমাদের সংস্কৃতিতে আঘাত হানে। আমাদের ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়। করাচীতে এক আলোচনায় তারা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে প্রবল আন্দোলন শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৩ সালে প্রথম ভাষা শহীদ দিবস পালন করা হয়। আরমানিটোলায় এক সভায় এ দিবস পালনের দাবি তোলা হয়। এরপর ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরেও পাকিস্তানিরা থেমে থাকেনি। তারা তখন উর্দু হরফে বাংলা লেখার নিয়ম করে, আরবি হরফে বাংলা লেখার নিয়ম করে। রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ করে। যার প্রতিবাদে ছাত্রসহ সবাই রাজপথে নেমে আসে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই আমরা ভাষা আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করেছি। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
শেখ হাসিনা বলেন, একটা সময় আমাদের দেশে জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি শেখ মুজিবের নাম মুছে ফেলা হয়েছিল। সেসময় অনেকে বলেছেন, শেখ মুজিব তো আন্দোলন করেননি, জেলে ছিলেন। কিন্তু তিনি তো ভাষা আন্দোলনের জন্যই কারাবরণ করেছেন।
সরকারপ্রধান বলে ,মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই তিনি সবার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যার ২১ বছর পর আমরা ক্ষমতায় আসি। এক দফার পর পরবর্তীতে তিন দফায় ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য ২০৪২ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়ে তোলা। আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যারা একুশে পদক পেয়েছেন সবাইকে আমার অভিনন্দন। এমন আরও অনেকেই আছেন, যাদের নাম আমরা জানি না। তাদের অবদানকে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। আমাদের নতুন প্রজন্ম যেন তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এগিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করেছি, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। যখন ২০২১ সালে আমরা উন্নয়নশীল দেশ পেয়েছি, তখন আমাদের ঘোষণা- ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
তিনি বলেন, শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্য চর্চা, সংস্কৃতি- সেই সঙ্গে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ সব দিক থেকে বাঙালি জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করেই চলবে। সেটাই আমি আশা করি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবসময়ই আমরা একুশ জনকে পদক দেই, যেন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণে থাকে। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে উন্নত আধুনিক দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো। যারা পদক পেয়েছেন তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই ও যারা বেঁচে নেই (মরণোত্তর সম্মাননাপ্রাপ্ত) তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শুধু ভাষা আন্দোলনে অংশই নেননি, ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য জেলে যান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলায় এক সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
সরকার প্রধান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই যুদ্ধ হয় কিন্তু কোথাও এক দেশ অন্য দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে না। যেভাবে পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হেনেছিল। তারই ফলস্বরূপ ভাষা আন্দোলন আর ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গতি পায় ভাষা আন্দোলন। আর ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে ভাষা শহীদ দিবস পালনের দাবি তোলা হয়। বারবার আঘাত আসার পরও বাংলা আজ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। শহীদের রক্ত কখনও বৃথা যেতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চায় কোনো বাধা নেই। যতই বাধা আসুক আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি - সবদিক থেকে বাংলাদেশকে একটি স্মার্ট দেশ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’

Join the conversation