পবন চন্দ্র বর্মণ

প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হল অনেকটাই ক্রিকেটের বর্তমানের জনপ্রিয় সংস্করণ T-20 এর মতো।

T-20 ক্রিকেটে যেমন জয়লাভের জন্য একটি টিমকে শারীরিক, মানসিক, কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে যেতে হয় এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তেমনি স্বল্প সময়ের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফলতার জন্যও আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় বসতে হবে।

মনে রাখতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে আপনার সফলতা। আপনি কৌশলী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে ছিটকে যেতে পারেন। এইটা সত্য যে, বিজেএস পরীক্ষার সিলেবাস অনেক বিশাল কিন্তু শুধু বিশাল সিলেবাসের অজুহাতে ও চাপে পড়ে ভড়কে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

শেষ সময়গুলো কাজে লাগান, অযথা সময় নষ্ট না করে, ফেসবুকে সারা দিন সময় না কাটিয়ে, বন্ধুদের আড্ডায় সময় ব্যয় না করে বইয়ের সঙ্গে শেষ মুহূর্তগুলো কাটানোর চেষ্টা করুন। মেধা কম বেশি বড় ফ্যাক্টর নয়, কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মিলে না।

মনে রাখবেন, পরিশ্রম ছাড়া সাফল্য ধরা দেয় না। মাত্র কয়েকটি দিনের কষ্টই আপনার মনের কোণে লুকায়িত স্বপ্ন পূরণ করার পথে আপনাকে পরিচালিত করতে পারে। নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস ও মনে সাহস রাখুন।

সে ক্ষেত্রে পারিবারিক মতবিনিময় লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক হতে পারে। আপনার আপাতত টার্গেট হবে শুধু প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়া।

একজন আইনের ছাত্র হিসেবে তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হল সহকারী জজ/ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করা। আর এ জন্য আপনাকে প্রিলিমিনারিী, লিখিত ও ভাইভা- এই ৩টা ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করতে হবে।

বিগত ৯ম, ১০ম ও ১১তম বিজেএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে আইন বিষয়ে ৬০-৮০ মার্কের প্রশ্ন এসেছে। সুতরাং প্রলিমিনারি পরীক্ষায় পাস করতে হলে আপনাকে অবশ্যই সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত আইনগুলোর মূল বিষয়বস্তু, ধারা, উপধারা, সিডিউল, বিভিন্ন আইনে উল্লেখিত তামাদির মেয়াদগুলোর ওপর সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ধারা, ধারার বিষয়বস্তু যতদূর সম্ভব নোট করে রাখুন।



বিগত বছরগুলোয় সংবিধান থেকে ৩-৪-৫টি করে প্রশ্ন এসেছে। আর সংবিধান থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হল সংবিধানের ১ম সংশোধনী থেকে শুরু করে সর্বশেষ ষোলোতম সংশোধনী পর্যন্ত এবং সংশোধনীর বিষয়বস্তু, সাল, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারসহ বিখ্যাত কিছু মামলার নজির সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

দেওয়ানি আইনগুলোর মধ্যে দেওয়ানি কার্যবিধি আইনের ক্ষেত্রে মূল আইনের ধারাগুলোর উল্লেখযোগ্য হল দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার, মোকদ্দমা স্থানান্তরের ক্ষমতা, রেস-সাবজুডিস, রেস-জুডিকেটা, কমিশন, আপিল, রিভিউ, রিভিশন, আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারাগুলো এবং এই বিষয়গুলো ভালোভাবে স্মরণে রাখতে হবে।

তবে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আদেশ-০১ মোকদ্দমার পক্ষগণ, আদেশ-০৫ সমন দেয়া ও সমন জারি, আদেশ-০৬ প্লিডিংস, আদেশ-০৭ আরজি, আদেশ-০৮ লিখিত জবাব, আদেশ-০৯ পক্ষগণের হাজিরা ও গরহাজিরার পরিণাম, আদেশ-১১ আবিষ্কার ও পরিদর্শন, আদেশ-১৭ মুলতবি এই বিষয়গুলো ছাড়াও আদেশ-২০, ২২, ৩৯, ৪৫, ৪৬, ৪৭ এগুলো সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের স্থাবর সম্পত্তির বেদখল পুনরুদ্ধার, দলিল সংশোধন, দলিল বাতিল, ঘোষণামূলক ডিক্রি, নিষেধাজ্ঞা (অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা) ইত্যাদি বিষয়গুলোয় আবার চোখ বুলিয়ে নিন।

সাক্ষ্য আইন থেকে সাক্ষ্য কী, কোনো কোনো বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেয়া যায়, স্বীকৃতি (ধারা-১৭ টু ধারা-৩১), স্বীকারোক্তি, দলিল, দালিলিক সাক্ষ্য, মৌখিক সাক্ষ্য এবং আদালতের দৈনন্দিন সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য এ আইনের ৩য় খণ্ড অর্থাৎ সাক্ষ্য উপস্থাপন ও উহার ফলাফল অর্থাৎ অধ্যায়-৭ হতে প্রমাণের দায়িত্ব (Burden of Proof), Estoppel, জবানবন্দি (Examination-in-chief), জেরা (Cross-examination), পুনঃজবানবন্দি (re-examination), সাক্ষ্য গ্রহণের ক্রম, ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন (Leading questions) এবং স্যুট ভ্যালুয়েশন আইনের-১১ ধারা অর্থাৎ মোকদ্দমা বা আপিলে মূল্যমান সঠিক মূল্যায়ন না হলে কী হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে।

ফৌজদারি আইনগুলোর মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি আইন থেকে আদালতের গঠন, প্রকারভেদ, চার্জ, বিচার পদ্ধতি, জামিন, আপিল এবং রিভিশন, কোয়াশমেন্ট, ১৪৪/১৪৫ ধারা, সংক্ষিপ্ত বিচার এবং দণ্ডবিধি আইন থেকে জেনারেল এক্সসেপশনস বা সাধারণ ব্যতিক্রমগুলো, শাস্তিগুলো এবং অধ্যায়-১৬ মানুষের শরীর বা মানবদেহ সম্পর্কিত অপরাধগুলো খুন, অপরাধজনক নরহত্যা, আঘাত (Hurt) অপহরণ (Kidnapping), অপবাহন, অবৈধ আটক ও অবৈধ অবরোধ, ধর্ষণ ইত্যাদি এবং অধ্যায়-১৭ সম্পত্তি সম্পর্কিত অপরাধ চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা, ডাকাতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, তফসিল।



Special Power Act-1974 এর prejudicial Act কোনোগুলো, কোনো কোনো অপরাধের বিচার এই আইনে করা হয়, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচার পদ্ধতি, তদন্ত পদ্ধতি, Advisory Board এর গঠন, সান্ধ্য আইন, স্মাগলিংসহ এই আইনের অধীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উপায় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ক্ষেত্রে অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের শাস্তি, যৌতুকের শাস্তি, ধর্ষণের শাস্তি, স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল গঠন, বিচার পদ্ধতি, তদন্তের পদ্ধতি ও সময়সীমা, জামিন এবং এ ছাড়া Arms Act, Nacrotics Act ও চোখ বুলিয়ে নিন।

শিশু আইন-২০১৩ এর শিশুর সংজ্ঞা, প্রবেশ কর্মকর্তার নিয়োগ, দায়িত্ব ও কর্তব্য, শিশুকল্যাণ বোর্ড ও তার কার্যাবলী, শিশুবিষয়ক ডেস্ক ও শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা, শিশু আদালত গঠন, আদালতের ক্ষমতা ও কার্যাবলী, গ্রেফতার, তদন্ত ও শিশুর উন্নয়নবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং যৌতুক নিরোধ আইনের অধীনে যৌতুকের সংজ্ঞা, যৌতুক গ্রহণ ও প্রদানের শাস্তি, অপরাধের আমলযোগ্যতা এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের অধীনে বাল্যবিবাহ সম্পাদন বা পরিচালনার শাস্তি, অপরাধের আমলযোগ্যতা, বিচার ইত্যাদি উপরোক্ত বিষয়গুলোর ওপর দক্ষতা রাখতে হবে।

সিলেবাসের বিশেষ আইনগুলোর মধ্যে তামাদি আইনের অধীনে সিডিউল, সিডিউলে উল্লেখিত সময়সীমা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এ ছাড়া মামলা, আপিল ও দরখাস্তের ক্ষেত্রেও তামাদির মেয়াদ, তামাদির সময় হিসাব, Easement এবং Negotiable Instruments Act এর অধীন Negotiable Instruments এর সংজ্ঞা, চেক এর সংজ্ঞা, চেক ডিসঅনারের কারণ এবং প্রতিকার এবং কোথায় মামলা দায়ের করতে হয় এবং মামলা দায়েরের পদ্ধতি ও বিচার পদ্ধতি ও আপিল সংক্রান্ত বিধানাবলী।

SAT & NAT আইনের অধীনে অগ্রক্রয় (Pre-emption) এবং এদের পার্থক্য, রিডেম্পশন, বিভিন্ন ধরনের জরিপ এবং খতিয়ানের ইতিহাস এবং জেনারেল ক্লোজেস আইনের ০৩-ধারাসহ ধারা-০৬, ০৭, ০৮, ০৯, সিভিল কোর্টস আইনের দেওয়ানি আদালতের প্রকারভেদ, আদালতগুলোর এখতিয়ার, স্মল কজেজ কোর্টের এখতিয়ার, স্ট্যাম্প আইন থেকে ধারা-১১ এবং কোনো ধরনের দরখাস্তে কত টাকার স্ট্যাম্প লাগাতে হয়, দরখাস্তে স্ট্যাম্প না লাগানোর ফলাফল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প বাবদ বিশেষ সুবিধা রয়েছে, কোর্ট ফিস আইন অনুযায়ী কোর্ট ফির প্রকারভেদ, কোনো প্রকারের মোকদ্দমায় কত টাকার কোর্ট ফি দিতে হয় এবং এই আইনের তফসিল বিষয়ে ধারণা রাখতে হবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন থেকে সম্পত্তি হস্তান্তর কী, কী কী হস্তান্তর করা যায়, কে হস্তান্তরের যোগ্য, Doctrine of Election, lispendence, part-performance, fraudulent transfer, marshalling, বিক্রয়, রেহেন (mortgage) দান, ইজারা, বিনিময় (Exchange) ইত্যাদি বিষয়াবলী চোখ বুলিয়ে নিন।

আবার রেজিস্ট্রেশন আইনের দলিল রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধতি, কোনো কোনো দলিল রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক, বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রিযোগ্য দলিলের রেজিস্ট্রেশন না করার ফলাফল ইত্যাদি এবং ADR এর বিভিন্ন পদ্ধতিগুলো (মধ্যস্থতা, সালিশ, আলোচনা) and প্রচলিত আইনে (cpc, crpc, Artha rin adalat etc) এডিআর এর বিধানগুলো ও লিগ্যাল এইড আইনের ক্ষেত্রে জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটি, জেলা কমিটি, ইউনিয়ন কমিটির গঠন, কার্যাবলী, দায়িত্ব ইত্যাদি। ইহা ছাড়াও চুক্তি আইন হতে চুক্তি, চুক্তির প্রকারভেদ অঙ্গীকারনামা, কে চুক্তি করতে পারে, চুক্তির অনুমোদন, চুক্তিভঙ্গের ফলাফল, agency, principal বিষয়গুলোর ওপর নজর দিন।

পরিবেশ আইন, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রক হতে পারেন, তার দায়িত্ব, কার্যাবলী, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের বিচার পদ্ধতি, আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কে ধারণা সুস্পষ্ট রাখুন।

আবার ব্যক্তিগত আইন (মুসলিম আইন ও হিন্দু আইন) হতে বিবাহ, বহুবিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, মোহরানা, ভরণপোষণ, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ থেকে পারিবারিক আদালতের গঠন, কোনো কোনো বিষয় এ আদালতের বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে, বিচার পদ্ধতি, ডিক্রিকৃত টাকা আদায়ের পদ্ধতি এবং পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাকের পদ্ধতি, বহুবিবাহ এবং গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ড আইনের অধীনে নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্তি এবং নাবালকের সম্পত্তি বিক্রয় করার পদ্ধতি এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

এটা ছাড়াও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের কিছু বিখ্যাত মতবাদ, রায়, আইনের কমন ম্যাক্সিমগুলো, Specially Latin maxims, Abbreviations, প্রচলিত আইনগুলোর সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে আপনাকে আপ-টু-ডেট নোট রাখতে হবে। সাধারণ জ্ঞানের জন্য পড়তে হবে অনেক বই। সবার জন্য শুভকামনা।

লেখক : সিনিয়র সহকারী জজ, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, গাইবান্ধা।

 


Comments